Blog Details

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সোনালী দুপুরঃ

Author

SUMON MORSHED

910104

ARCHITECT

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের প্রথম একাডেমিক ভবনের পেছনে একটি খাল ছিল, কোথা থেকে জানি নিরবে এসে চুপচাপ একে বেকে সবুজের বুক চিরে আবার কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিল তা আর আজ মনে পড়ে না। তবে দুপুরের দিকে, ক্লাসের বিরতিতে, মাঝে মাঝেই চোখে পড়তো সেই খাল, চার পাঁচটা মহিষ ভীষন গরমে খালের টলমলে জলে গা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো প্রায়শই। কোন নড়াচড়া নেই, একই দৃষ্টিতে দূরে কোথায় জানি তাকিয়ে থাকতো। তাদের শিংগুলোর উপর দু চারটা শালিক বসে লাফালাফি করতো। খালের পানিতে সূর্যের আলো পড়তেই চিকচিক করে উঠতো, সবুজ ঘাস, দূরের ধান ক্ষেত, যত দূর চোখ যেতো কেবল সবুজ আর সবুজ, ভীষন নির্জন প্রকৃতি আর তার সাথে তাল মিলিয়েই আমাদের ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরব পথ চলা। কি যে সুন্দর সোনালী দুপুর, বলে বোঝানো কঠিন, আজো মনে পড়তেই আনন্দ খেলে যায় মনে, ফিরে যেতে মন চায় সেই দুপুরের কাছে।

কি কারনে কেন জানি সে সময়টাতে পানির সুনিকটে গিয়ে খোলা রোদের নীচে চুপচাপ বসে দুপুরের সেই দৃশ্য মন ভরে দেখা হয়ে উঠেনি কখনো, কষ্ট করে একটু হেটে খালের কাছে গিয়ে পানির ধারে দু’দন্ড দাড়িয়ে মহিষ আর শালিকের সাথী হতে পারিনি, দু চার দশ মিনিট সময় কাটানো হয়নি। হাতে যে সময় ছিলনা তেমনটা নয়। কি এমন ক্ষতি হতো দশ মিনিট সেই সুন্দরের স্বাক্ষী হলে। আসলে বিষয় হলো অল্প বয়সে সত্যিকারের সুন্দরকে কদর করবার উপলব্ধি আমার তখন হয়নি। সহপাঠীদের সাথে অলস আড্ডা দিয়েই সময় কাটতো বেশী নতুবা হলে ফিরে যাওয়া বা অন্যকিছু।

 

যখন বছরের অর্ধ ভাগের পরীক্ষা শুরু হতো, গরমের সময়, তখন দিনগুলো হতো লম্বা। সুদীর্ঘ দুপুর, দুপুরের আহার শেষে হোস্টেলের রুমে বসে সারা সেমিস্টারের পড়া দুচার দিনে শেষ করবার চাপ থাকতো, পাঠে মন বসতো না, খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই অবাক লাগতো, যা দেখতাম তাই ভালো লাগতো, মনে হতো এতো সুন্দর দুপুরতো এর আগে কোন দিন চোখে পড়েনি, মহিষগুলো আর শালিকদের কথা মনে হতো, বার বার মনে হতো এবার পরীক্ষা শেষ হোক, আয়েশ করে দুপুরটা উপভোগ করবো। কোন ভাবেই এই সোনালী দুপুর আর বিকেল বেলা মাঠে না কাটিয়ে বাড়ী ফিরে যাবো না। কতো বার যে একই প্রতিজ্ঞা করেছি, পরীক্ষাও শেষ হয়েছে তথাপিও সেই বিকেলের কাছে আর আমার আর ফিরে যাওয়া হয়নি।সুন্দরকে উপভোগ করাও হয়নি।ভীষণ আফসোস হয় আজও।

 

এখন মনে হয় বন্দী দশায় মুক্ত সবকিছুই অসাধারন মনে হয়, সে সময়টায় প্রকৃতির প্রকৃত স্বরুপকে উন্মোচন করতে পারা যায় সহজে, মনের জানালাগুলো খুলে গিয়ে মিশে যায় তেপান্তরে আর যখন মুক্ত অবস্হায় ফিরে আসা হয় তখন আমাদের বেয়াড়া মন ছুটে চলে মরীচিকার পেছনে। অনেকেরই জীবনের বড় অংশ কেটে যায় হাতের কাছে থাকা ছোট্ট ছোট্ট অনিন্দ সুন্দরের সাক্ষাত পেয়েও তার কাছে পৌঁছাতে না পারার ব্যর্থতা। অনেক পরে এসে মনে হয় হায়! ফেলে এসেছি সেই সুযোগ। সরল, সঠিক আর সুন্দরকে বুঝতে পেরেও তার কদর করা হয়ে উঠেনি নকল কিছুর আশায়।

এই বোধ উদয়ের পরই আসে উপলব্ধি যা আমাদের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা করে। আমরা এই অধ্যায়ে এসে থামতে চাই, খুব ছোট ছোট ভালো লাগার জন্য কাতর হই।সুযোগ খুঁজে বেড়াই ফেলে আসা সোনালী দুপুরের কাছে সামান্য সময়ের জন্য হলেও ফেরত যেতে, জীবনের গতি আমাদেরকে থামতে দেয় না জীবনটাই থেমে না যাওয়া পর্যন্ত।